১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এআই ব্যবহারে কাজের গতি বাড়লেও কমছে না কর্মীদের চাপ, বলছে নতুন জরিপ

calendar_month ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৩:২১:৫৬ person অনলাইন ডেস্ক
এআই ব্যবহারে কাজের গতি বাড়লেও কমছে না কর্মীদের চাপ, বলছে নতুন জরিপ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল, এটি মানুষের কর্মজীবনকে সহজ করে তুলবে। কাজ দ্রুত শেষ হবে, চাপ কমবে এবং সময় বাঁচবে। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপের ফল বলছে ভিন্ন কথা। বাস্তবে অনেক কর্মীর কাছে এআই ব্যবহারের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি উল্টো হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জরিপ কী বলছে?

যুক্তরাজ্যে দুই হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর এই জরিপ চালানো হয়েছে। এতে অংশ নেওয়া প্রতি চারজনের একজন জানিয়েছেন, চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল ব্যবহারের কারণে তাঁদের কাজের চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে। জরিপটি পরিচালনা করেছে জরিপ সংস্থা ইউগভ, উদ্যোগে ছিল প্রযুক্তিনির্ভর বিমা প্রতিষ্ঠান ইউলাইফ।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত এআই টুল ব্যবহার করেন এমন কর্মীদের মধ্যে ২৩ শতাংশ বলেছেন, প্রযুক্তিটি ব্যবহারের ফলে তাঁদের কাজের পরিমাণ বেড়ে গেছে। আবার ২৬ শতাংশের মত, এআই ব্যবহারের কারণে তাঁদের ওপর কাজের চাপও বেড়েছে। অর্থাৎ কাজ দ্রুত শেষ করার সুযোগ থাকলেও তা কর্মীদের জন্য স্বস্তির বদলে বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

চাকরি হারানোর শঙ্কাও কম নয়

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের এক তৃতীয়াংশ মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে তাঁদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এই জরিপেও তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।

উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কর্মীদের লাভ কতটা

জরিপে উঠে এসেছে, এআই ব্যবহারের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা এবং আয় দুটোই বাড়ছে। তবে সেই বাড়তি আয়ের সুফল কর্মীদের পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ। প্রতি তিনজনের একজন অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ মনে করেন, এই বাড়তি আয় কর্মীদের কল্যাণ বা দক্ষতা উন্নয়নে খরচ করা হবে না।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফাবিয়ান স্টেফানি এআই ও কর্মক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, এখানে একধরনের বিদ্রূপাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এআইয়ের সাহায্যে কাজ দ্রুত শেষ করা গেলেও, ঠিক সেই কারণেই কাজের পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে।

কর্মীদের মানসিক অবসাদ বা বার্নআউট নিয়ে কাজ করেন এমন ক্যারিয়ার কোচ কেলি সুইংলারও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন এআই তাঁদের কাজ সহজ করে দেবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে তার উল্টোটা। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কর্মীদের কাছ থেকে বেশি কাজ, দ্রুত সাড়া এবং সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকার প্রত্যাশা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাতেও একই চিত্র

শুধু যুক্তরাজ্যের জরিপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির একটি গবেষণায়ও একই ধরনের প্রবণতা উঠে এসেছে। গবেষকেরা দেখেছেন, এআই ব্যবহারের ফলে কর্মীদের অনেককেই আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় এবং আরও তীব্র গতিতে কাজ করতে হচ্ছে।

মূল কারণ হলো, এআই ব্যবহার করে অনেক কাজ আগের চেয়ে দ্রুত শেষ করা যাচ্ছে, আবার কিছু কাজ এআইকে দিয়েই করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে যে সময় বেঁচে যাচ্ছে, তা অবসরে না কাটিয়ে কর্মীরা নতুন প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছেন এবং আগের চেয়ে বেশি দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছেন।

এআই উৎপাদনশীলতা বৈপরীত্য

ইউলাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টাল গিলবার্টের মতে, কর্মজগতে একধরনের প্রজন্মগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। এআই কাজের পদ্ধতি বদলে দেওয়ার বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি একটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন এআই উৎপাদনশীলতা বৈপরীত্য। অর্থাৎ যে প্রযুক্তি মূলত সময় বাঁচানোর জন্য তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তা অনেক সময় কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

শেষ কথা

এআই প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কাজ সহজ ও দ্রুত হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতাও বাড়ছে। কিন্তু এই জরিপ ও গবেষণাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে, প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সুফল আসলে কার কাছে যাচ্ছে। যদি বাড়তি উৎপাদনশীলতার সুফল কর্মীদের জীবনে প্রতিফলিত না হয়ে শুধু কাজের চাপ বাড়ায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়ের জন্যই নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন