প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য এবার এসে গেছে বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর বুধবার, প্যাসিফিক সময় সকাল ১০টায় অ্যাপল আয়োজন করছে তাদের বার্ষিক ইভেন্ট, যেখানে উন্মোচিত হবে ২০২৬ সালের নতুন আইফোন লাইনআপ। এবারের আয়োজন যেন আগের সব বছরের চেয়ে আলাদা—কারণ চিরচেনা স্ল্যাব-স্টাইল আইফোনের পাশাপাশি অ্যাপল প্রথমবারের মতো নিয়ে আসছে তাদের ফোল্ডেবল ডিভাইস। এর সঙ্গে থাকছে নতুন অ্যাপল ওয়াচ, নতুন এয়ারপডস এবং আরও কিছু চমক।
দীর্ঘদিনের গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে অ্যাপল এবার তাদের প্রথম ফোল্ডেবল ডিভাইস উন্মোচন করতে যাচ্ছে। অফিসিয়াল নাম এখনো নিশ্চিত না হলেও, গুঞ্জন অনুযায়ী এটি পরিচিত হতে পারে iPhone Ultra নামে।
অ্যাপল এমন একটি বুক-স্টাইল ফোল্ডেবল ডিজাইন করেছে, যা খোলার পর দেখতে অনেকটা আইপ্যাডের মতো লাগবে। ফোল্ড করা অবস্থায় থাকবে প্রায় ৫.৫ ইঞ্চির OLED আউটার ডিসপ্লে, আর খোলার পর পাওয়া যাবে প্রায় ৭.৮ ইঞ্চির বড় OLED স্ক্রিন। খোলা অবস্থায় ডিভাইসটির আকৃতি হবে উচ্চতার চেয়ে চওড়ায় বেশি—অনেকটা আইপ্যাড মিনিকে মাঝখান থেকে ভাঁজ করলে যেমন দেখাবে, তেমন। স্যামসাংয়ের সাম্প্রতিক গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড৮-এর সঙ্গে এর মিল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্রিজ-মুক্ত ডিজাইনের ইচ্ছা থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অ্যাপল একেবারে ক্রিজমুক্ত ডিজাইন দিতে পারছে না। তবে থাকছে সর্বনিম্ন ক্রিজ এবং টেকসই লিকুইড মেটাল হিঞ্জ। বারবার ভাঁজ করার ফলে সৃষ্ট মাইক্রো-ক্র্যাক পূরণে ব্যবহার করা হতে পারে বিশেষ অপটিক্যালি ক্লিয়ার আঠা, যা সময়ের সঙ্গে ক্রিজ কম দৃশ্যমান রাখতে সাহায্য করবে।
খোলা অবস্থায় iPhone Ultra-এর পুরুত্ব হতে পারে মাত্র ৪.৫ মিলিমিটার—যা একে অ্যাপলের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পাতলা আইফোনে পরিণত করবে। ভাঁজ করা অবস্থায় এটি হবে প্রায় ৯ মিলিমিটার, যা iPhone 17 Pro Max-এর ৮.৭৫ মিলিমিটার পুরুত্বের কাছাকাছি। এত পাতলা বডির কারণে অ্যাপলকে কিছু ডিজাইন আপস করতে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—ট্রুডেপথ ক্যামেরা সিস্টেমের জন্য জায়গা না থাকায় Face ID বাদ পড়ছে, বদলে থাকছে Touch ID। এটি বসানো হবে সাইড বাটনে, অনেকটা আইপ্যাড এয়ার ও আইপ্যাড মিনির মতো। ফেস আইডি না থাকলেও ইনার ও আউটার—দুই ডিসপ্লের জন্যই থাকবে আলাদা ফ্রন্ট ক্যামেরা। একইভাবে জায়গার সংকটে থ্রি-লেন্স রিয়ার ক্যামেরা সিস্টেমও বাদ পড়ছে; বদলে থাকছে আল্ট্রা ওয়াইড ও ওয়াইড লেন্স, যা ফোল্ড কিংবা আনফোল্ড—দুই অবস্থাতেই কাজ করবে।
আগে ধারণা করা হয়েছিল ম্যাগসেফ থাকবে না, তবে ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী ম্যাগসেফ চার্জিং ফিচার হিসেবে যুক্ত থাকছেই।
পারফরম্যান্সের দিক থেকে iPhone Ultra চলবে ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির A20 Pro চিপে, যা A19 Pro-এর তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ দ্রুত এবং ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি শক্তি সাশ্রয়ী হতে পারে। এতে থাকতে পারে ৭-কোর জিপিইউ, প্রশস্ত মেমোরি ইন্টারফেস এবং বড় L2 ক্যাশ, পাশাপাশি ১২ জিবি র্যাম।
মডেমের ক্ষেত্রে অ্যাপল নিজস্ব C2 চিপ ব্যবহার করতে পারে, যা C1X-এর চেয়ে দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এতে mmWave প্রযুক্তি থাকবে কিনা তা স্পষ্ট নয়; না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের মডেলে ব্যবহার হতে পারে কোয়ালকমের মডেম।
ব্যাটারির দিক থেকে প্রতিটি ভাঁজে আলাদা ব্যাটারি থাকবে, মোট ক্ষমতা হতে পারে ৫,৪০০ থেকে ৫,৮০০ mAh-এর মধ্যে, যেখানে iPhone 17 Pro Max-এর ব্যাটারি ৫,০৮৮ mAh। রঙের দিক থেকে থাকছে সিলভার/সাদা এবং গাঢ় ইন্ডিগো শেড, যা প্রায় কালোর কাছাকাছি।
সফটওয়্যার দিক থেকেও থাকছে বড় পরিবর্তন। অ্যাপল ডেভেলপারদের বলেছে বিভিন্ন আকার ও অ্যাসপেক্ট রেশিওর জন্য অ্যাপ ডিজাইন করতে, যাতে দুটি ফোল্ডেবল স্ক্রিনেই স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করা যায়। আইপ্যাডের মতো মাল্টিটাস্কিং, সাইড-বাই-সাইড অ্যাপ ও সাইডবার সাপোর্ট থাকতে পারে এতে।
ডিজাইনের দিক থেকে iPhone 18 Pro মডেলগুলো দেখতে অনেকটা iPhone 17 Pro-এর মতোই হবে, বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না। তবে ব্যাটারি বড় হওয়ায় Pro Max মডেলটি সামান্য মোটা ও ভারী হতে পারে। ক্যামেরা প্লাটোও কিছুটা মোটা হতে পারে নতুন ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার লেন্স যুক্ত করার জন্য। তবে iPhone 17 Pro-এর কেসগুলো নতুন মডেলেও ব্যবহারযোগ্য হবে বলে জানা যাচ্ছে।
রঙের ক্ষেত্রে নতুন সংযোজন হতে পারে ডার্ক চেরি, লাইট ব্লু এবং সিলভার—তবে কালো রঙের কোনো অপশন নাও থাকতে পারে। iPhone 17 Pro-তে ফ্রস্টেড গ্লাস ব্যাক ও অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের মধ্যে স্পষ্ট রঙের পার্থক্য থাকলেও, iPhone 18 Pro-তে তা কিছুটা কম প্রকট হতে পারে। সামগ্রিক আকৃতি অপরিবর্তিত থাকলেও ডায়নামিক আইল্যান্ড আকারে কিছুটা ছোট হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে, যদিও একেবারে বাদ দেওয়ার আগের গুঞ্জন সত্যি হচ্ছে না।
ব্যাটারি লাইফেও আসতে পারে লক্ষণীয় উন্নতি—Pro Max মডেলে ৫,৫৬৭ mAh ব্যাটারি, ২ ন্যানোমিটার A20 Pro চিপের কার্যকারিতা এবং নতুন LTPO+ ডিসপ্লে প্রযুক্তির কারণে।
ক্যামেরার দিক থেকে সবচেয়ে বড় আপগ্রেড হতে পারে ডিএসএলআর-এর মতো ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার, যা ব্যবহারকারীদের আলোর নিয়ন্ত্রণে বাড়তি স্বাধীনতা দেবে। উজ্জ্বল আলোয় ছোট অ্যাপারচার এক্সপোজার উন্নত করবে, আবার কম আলোয় বড় অ্যাপারচার বেশি আলো প্রবেশ করিয়ে গ্রেইন কমাবে ও ছবি করবে আরও শার্প। ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার নিয়ন্ত্রণেও এটি সহায়ক হবে। কিছু গুঞ্জন বলছে এই ফিচার শুধু Pro Max মডেলে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
স্যামসাংয়ের তৈরি থ্রি-লেয়ার স্ট্যাকড ইমেজ সেন্সরও ব্যবহৃত হতে পারে, যা ক্যামেরাকে আরও দ্রুত সাড়াদানকারী করবে এবং কম আলোয় পারফরম্যান্স উন্নত করবে। টেলিফটো লেন্সেও বড় অ্যাপারচার আসতে পারে, তবে আল্ট্রা ওয়াইড বা ফ্রন্ট ক্যামেরায় কোনো পরিবর্তনের গুঞ্জন নেই। ক্যামেরা কন্ট্রোল বাটনও সরলীকৃত হতে পারে—ক্যাপাসিটিভ সোয়াইপ ফিচার বাদ দিয়ে।
ফোল্ডেবল আইফোনের মতোই, কিছু বা সব iPhone 18 Pro মডেলে থাকতে পারে অ্যাপলের C2 মডেম, তবে যুক্তরাষ্ট্রের মডেলে mmWave সমর্থনের জন্য কোয়ালকম মডেমও ব্যবহৃত হতে পারে।
মেমোরি ও স্টোরেজের খরচ বৃদ্ধির কারণে iPhone 18 Pro মডেলগুলোর দাম iPhone 17 Pro-এর তুলনায় বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে ম্যাক ও আইপ্যাডের দামও বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন মডেলগুলোর দাম ১০০ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ৯ সেপ্টেম্বরের এই ইভেন্ট শুধু নতুন আইফোন উন্মোচনের অনুষ্ঠান নয়—এটি অ্যাপলের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে, যেখানে ফোল্ডেবল প্রযুক্তি প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিচ্ছে তাদের প্রধান পণ্যের কাতারে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিপ্রেমীদের চোখ এখন সেদিকেই।
মন্তব্য
এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.