অ্যাপল সম্প্রতি বাজারে এনেছে তাদের নতুন ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন আইফোন ১৮ প্রো এবং আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স। বাইরে থেকে দেখলে এই দুটি ফোনকে আগের আইফোন ১৭ প্রো সিরিজের প্রায় হুবহু মনে হতে পারে—সামান্য ছোট ডায়নামিক আইল্যান্ড আর কিছু নতুন কালার অপশন ছাড়া চোখে তেমন পার্থক্য ধরা পড়ে না। কিন্তু ভেতরের দিকে তাকালে বোঝা যায়, অ্যাপল এবার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, যা ফটোগ্রাফি থেকে শুরু করে পারফরম্যান্স ও ব্যাটারি লাইফ—সবক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি হ্যান্ডস-অন রিভিউতে ফোন দুটির প্রধান ফিচারগুলো হাতে-কলমে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। সেখানে উঠে এসেছে ক্যামেরা, চিপ, ব্যাটারি ও Siri AI-এর মতো বিষয়ে বড় ধরনের আপগ্রেডের কথা, পাশাপাশি দাম বৃদ্ধি ও ওজন বাড়ার মতো কিছু নেতিবাচক দিকও। প্রযুক্তিপ্রেমী বাংলাদেশি পাঠকদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো জানা জরুরি, কারণ প্রিমিয়াম স্মার্টফোন বাজারে আইফোনের প্রতিটি নতুন সংস্করণই একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করে।
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ক্যামেরায়। ৪৮ মেগাপিক্সেলের মূল ফিউশন ক্যামেরায় এবার যুক্ত হয়েছে ছয়টি লেজার-কাট ব্লেড, যা ফোনকে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজে থেকেই অ্যাপারচার সমন্বয় করার ক্ষমতা দেয়। অর্থাৎ আলো কম হোক বা বেশি, ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক অ্যাপারচার বেছে নিয়ে ছবির ডেপথ অব ফিল্ড ও আলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
তবে যাঁরা নিজে হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাঁদের জন্যও রয়েছে সুযোগ। ব্যবহারকারীরা চারটি ভিন্ন রেঞ্জের মধ্যে থেকে ম্যানুয়ালি অ্যাপারচার বেছে নিতে পারবেন—পোর্ট্রেট মোডে ব্যাকগ্রাউন্ড বেশি ঝাপসা করতে চাইলে f/1.48, আবার পুরো দৃশ্যকে শার্প রাখতে চাইলে f/4.0 পর্যন্ত। রিভিউতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বিভিন্ন অ্যাপারচার সেটিংয়ে তোলা ছবির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে—বিশেষ করে কম আলোর পরিবেশে।
পারফরম্যান্সের দিক থেকেও এবার বড় লাফ দিয়েছে অ্যাপল। নতুন A20 Pro চিপটি তৈরি হয়েছে 2nm প্রযুক্তিতে—যা কোম্পানির ইতিহাসে প্রথম। এই চিপে থাকা ৬-কোর সিপিইউর দুটি সুপার কোর আগের A19 Pro চিপের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ দ্রুত কাজ করতে সক্ষম। এছাড়া নতুন ৭-কোর জিপিইউ আগের প্রজন্মের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভালো গ্রাফিক্স পারফরম্যান্স দেয় বলে দাবি করা হয়েছে।
গেমিং পারফরম্যান্স পরীক্ষায় জনপ্রিয় গেম মনস্টার হান্টার চালিয়ে দেখা গেছে, গেমপ্লে ছিল একদম স্মুথ—ফ্রেম রেট পৌঁছেছে ১২০ fps পর্যন্ত। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ফোনের নতুন ও বড় ভেপার চেম্বার কুলিং সিস্টেম, যা আগের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ ভালো সাসটেইনড পারফরম্যান্স নিশ্চিত করে। এবার মেমোরি চিপকে স্ট্যাক করে না রেখে পাশাপাশি বসানো হয়েছে, যার ফলে তাপ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হয়েছে।
ব্যাটারি লাইফের দিক থেকেও এই ফোন দুটি বেশ এগিয়ে। অ্যাপলের দাবি অনুযায়ী, আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স একটানা ৪৫ ঘণ্টা ভিডিও প্লেব্যাক দিতে সক্ষম, আর আইফোন ১৮ প্রো দেয় ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত। আগের প্রজন্মের আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স ও আইফোন ১৭ প্রো যথাক্রমে ৩৯ ও ৩৩ ঘণ্টা ব্যাকআপ দিত—অর্থাৎ ব্যাটারি লাইফে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে।
চার্জিংয়েও এসেছে গতি। ৬০ ওয়াটের চার্জার দিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটে ৫০ শতাংশ চার্জ করা সম্ভব। আবার ম্যাগসেফ ব্যবহার করে ৩৫ ওয়াট স্পিডে ৩০ মিনিটে ৫০ শতাংশ চার্জ পাওয়া যাবে।
দীর্ঘদিন ধরেই Siri নিয়ে নানা সমালোচনা ছিল প্রযুক্তি বিশ্বে। তবে iOS 27-এর সঙ্গে আসা নতুন Siri অনেকটাই বদলে গেছে বলে জানা গেছে। এতে থাকা Visual Intelligence ফিচার দিয়ে ক্যামেরা কোনো পোস্টার বা নোটিশের দিকে তাক করলেই তাতে থাকা তারিখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে সরাসরি ক্যালেন্ডারে যোগ করার সুবিধা পাওয়া যায়।
এছাড়া নতুন Siri ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও প্রসঙ্গ অনেক ভালোভাবে বুঝতে পারে। যেমন, আসন্ন ফ্লাইটের তথ্য জানতে চাইলে তা সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে চলে আসে, এবং প্রয়োজনে পূর্ণ স্ক্রিনে গিয়ে আরও বিস্তারিত প্রশ্ন করা যায়।
সব দিক থেকে ইতিবাচক না হলেও কিছু বিষয়ে সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে দাম নিয়ে—আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্স উভয়েরই দাম ১০০ ডলার করে বেড়েছে। এখন আইফোন ১৮ প্রো-এর দাম শুরু হচ্ছে ১,০৯৯ ডলার থেকে, আর প্রো ম্যাক্সের দাম ১,১৯৯ ডলার। তুলনায়, স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি এস২৬ আলট্রার দামও শুরু হয় ১,২৯৯ ডলার থেকে—অর্থাৎ প্রিমিয়াম ফ্ল্যাগশিপ বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধি একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো ওজন। ভেরিয়েবল অ্যাপারচার ক্যামেরা, বড় কুলিং সিস্টেম ও বড় ব্যাটারির কারণে ফোন দুটি আগের চেয়ে ভারী হয়ে গেছে। আইফোন ১৮ প্রো-এর ওজন এখন ২১১ গ্রাম (আগে ছিল ২০৬ গ্রাম), আর প্রো ম্যাক্সের ওজন ২৪৯ গ্রাম (আগে ছিল ২৩৩ গ্রাম)।
তৃতীয় ঘাটতিটি এআই সহকারী সংক্রান্ত। নতুন Siri অনেক উন্নত হলেও, গুগলের Gemini Live বা ওপেনএআইয়ের ChatGPT Voice mode-এর মতো রিয়েল-টাইম লাইভ কথোপকথনের সুযোগ এখনো এতে নেই। বাস্তব জীবনে সমস্যার সমাধান বা কোনো কিছু নিয়ে তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যটি খুব কাজে আসে, আর সেখানেই অ্যাপল এখনো পিছিয়ে বলে মনে করা হচ্ছে।
অ্যাপলের নতুন ফোল্ডেবল ফোন আইফোন ডুও নিয়ে বাজারে বেশি আলোচনা হলেও, সবার জন্য এই ফোল্ডেবল ফোন উপযুক্ত নয়—বিশেষ করে এর ২,০০০ ডলারের দাম অনেকের জন্যই সাশ্রয়ী নয়। এমন প্রেক্ষাপটে আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্স তাদের জন্য একটি শক্তিশালী বিকল্প, যাঁরা প্রচলিত ডিজাইনের মধ্যে থেকেই ফ্ল্যাগশিপ ফিচার ও টেলিফটো জুম ক্যামেরা চান।
আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো ম্যাক্স বাহ্যিকভাবে খুব বড় পরিবর্তন না আনলেও, ক্যামেরা, চিপ, ব্যাটারি ও এআই সহকারীর দিক থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আপগ্রেড এনেছে। ভেরিয়েবল অ্যাপারচার ক্যামেরা ও শক্তিশালী A20 Pro চিপ ফটোগ্রাফি ও পারফরম্যান্স-নির্ভর ব্যবহারকারীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করবে। তবে দাম বৃদ্ধি, বাড়তি ওজন ও Siri-তে লাইভ কনভারসেশন ফিচারের অভাব—এই সীমাবদ্ধতাগুলোও উপেক্ষা করার মতো নয়। যাঁরা ফোল্ডেবল ফোনের দিকে না গিয়ে প্রচলিত ডিজাইনেই প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাঁদের জন্য আইফোন ১৮ প্রো সিরিজ এবারও একটি সিরিয়াস বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য
এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.