জাপানের উত্তরাঞ্চলীয় ইয়ামাগাতা জেলার সোনাই সমভূমি বহু আগে থেকেই ধান উৎপাদনের জন্য পরিচিত। পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝের এই বিস্তীর্ণ সমভূমিতে এখন এক নতুন ধরনের কৃষিযন্ত্র নজর কাড়ছে। জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষে দীর্ঘদিনের সমস্যা আগাছা নিয়ন্ত্রণের সমাধান হিসেবে সেখানকার কৃষকেরা ব্যবহার করছেন একটি ছোট, সৌরচালিত স্বয়ংক্রিয় রোবট। নাম ‘আইগামো রোবো’।
জাপানে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেমন উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধানের নতুন জাত নিয়ে গবেষণা চলছে, তেমনি বয়স্ক হতে থাকা সমাজে কৃষিতে জনবল সংকট মোকাবিলায়ও নানা প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই তৈরি হয়েছে আগাছা দমনের এই রোবট, যা কোম্পানি নিউগ্রিন বাজারে এনেছে।
রাসায়নিক আগাছানাশক ছাড়া জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষ করতে গেলে কৃষককে বারবার হাতে বা যন্ত্রের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। এতে সময়, শ্রম ও খরচ তিনটিই বাড়ে। জাপানে এই সমস্যার ঐতিহ্যবাহী সমাধান হলো আইগামো পদ্ধতি, যেখানে বুনো ও গৃহপালিত হাঁসের সংকর জাত ধানখেতে ছেড়ে দেওয়া হয়। কৃষক তাকাও ফুরুনোর হাত ধরে জনপ্রিয় হওয়া এই পদ্ধতিতে চারা রোপণের কয়েক সপ্তাহ পর হাঁসের ছানা মাঠে নামানো হয়। হাঁসগুলো আগাছা, পোকামাকড় ও ক্ষতিকর প্রাণী খেয়ে ফেলে, তবে ধানগাছের ক্ষতি করে না। তাদের চলাফেরায় পানি আলোড়িত হয়, মাটিতে অক্সিজেন প্রবাহ বাড়ে এবং জমি নরম থাকে। এমনকি হাঁসের বর্জ্যও প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে।
তবে এই পদ্ধতির নিজস্ব চ্যালেঞ্জও আছে। হাঁসকে শিকারি প্রাণী, খারাপ আবহাওয়া ও রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে হয়। ধানের শিষ আসার সময় হাঁস বড় হয়ে গেলে সেগুলো খেত থেকে সরিয়ে নিতে হয়, নয়তো তারা ফসলের ক্ষতি করতে পারে। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট যত্ন ও সময়সাপেক্ষ ব্যবস্থাপনা দাবি করে। ঠিক এখানেই আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল।
এই রোবটের পেছনের গল্প শুরু হয় ২০১১ সালে পূর্ব জাপানের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর। সে সময় জৈব ধান চাষে সহায়তা করতে গিয়ে নিসানের প্রকৌশলী তেৎসুইয়া নাকামুরা কৃষকদের কাছ থেকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হন, গাড়ি বানানো গেলে আগাছা পরিষ্কারের জন্য যন্ত্র তৈরি হবে না কেন। প্রশ্নটি তাঁর মাথায় গেঁথে যায়।
আইগামো পদ্ধতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি হাঁসের কাজ অনুকরণ করে একটি ছোট ভাসমান রোবটের প্রাথমিক নকশা তৈরি করেন। নিসান তাঁর এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগে সমর্থন দেয়, যা গাড়ি প্রকৌশলের অভিজ্ঞতা কৃষিপ্রযুক্তিতে কাজে লাগানোর একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে। শুরুর দিকে সময়, অর্থ ও প্রযুক্তিগত নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। পরে টোকিও ইউনিভার্সিটি অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির সহায়তায় গড়ে ওঠে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান এভারগ্রিন, যেখানে তেৎসুইয়া এখন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্ত। পরবর্তীতে যুক্ত হয় ইয়ামাগাতা ডিজাইন নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় কৃষকদের সমর্থন। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল হিসেবেই বাজারে আসে আইগামো রোবো, যার দ্বিতীয় সংস্করণ সম্প্রতি চালু হয়েছে।
আইগামো রোবোর সবচেয়ে বড় সুবিধা এর সহজ পরিচালনা পদ্ধতি। ধানখেতে নামিয়ে সুইচ চালু করলেই এটি নিজে থেকে কাজ শুরু করে দেয়। প্রতিটি ইউনিট প্রায় দেড় হেক্টর জমিতে কাজ করতে সক্ষম। প্রথম সংস্করণের ওজন ছিল প্রায় ১৬ কেজি, তবে দ্বিতীয় সংস্করণের ওজন কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কেজিতে, ফলে বহন করাও অনেক সহজ হয়েছে।
রোবটটি জ্বালানির বদলে সৌরশক্তিতে চলে, তাই পরিচালন খরচও কম। এর চলাচলের পথ ও ব্যাটারির অবস্থা স্মার্টফোন থেকেই দেখা যায় এবং কোনো জটিল সেটআপের প্রয়োজন হয় না। এ কারণে বয়স্ক কৃষক কিংবা ছোট ও মাঝারি আকারের খামারের জন্যও এটি সহজে ব্যবহারযোগ্য।
জিপিএসের সাহায্যে রোবটটি পুরো খেত চষে বেড়ায় এবং মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কোনাকুনি পথে চলাচল করে। চলার সময় ঘূর্ণায়মান নরম ব্রাশের সাহায্যে পানি ও মাটি আলোড়িত করে, যা চারাগাছের ক্ষতি না করেই আগাছার গোড়া দুর্বল করে দেয়। হাঁসের মতোই এটি পানি ঘোলা করে দেয়, যাতে সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে পৌঁছাতে না পারে। এতে আগাছার অঙ্কুরোদ্গম ও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি রোবটের তৈরি পানির নিচের কম্পন গোল্ডেন অ্যাপল শামুকের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে, ফলে এই শামুকের কারণে চারার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও কমে।
চলার পথে রোবট চারাগাছে আলতো ধাক্কা দিলেও তাতে গাছের ক্ষতি হয় না বলে জানিয়েছেন নাকামুরা। বরং এতে গাছের শিকড় আরও শক্ত হয় এবং বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়, কারণ ধানগাছ সাধারণত দৃঢ় প্রকৃতির এবং একবার নুয়ে পড়লেও দুই এক দিনের মধ্যে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে আগাছার শিকড় দুর্বল হওয়ায় সেগুলো সহজেই উপড়ে যায়। সর্বশেষ সংস্করণে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির অভিযোগ আসেনি বলেও জানান তিনি।
জাপানজুড়ে পরিচালিত পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে দেখা গেছে, এই রোবট ব্যবহারে আগাছা পরিষ্কারের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে, আর ফসলের ফলন বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। ছোট আকারের ধানখেতের জন্যও রোবটটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী, দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ ইয়েন।
ইয়ামাগাতার সুরুওকা শহরের ইনুউয়ে ফার্ম কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকাতোশি ইনুউয়ে দশ প্রজন্ম ধরে কৃষিকাজে যুক্ত একটি পরিবারের সদস্য। তিনি জানান, রাসায়নিক সার ছাড়া জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ধান পরিবেশের জন্য যেমন ভালো, তেমনি বাজারে বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় লাভও ভালো হয়। তবে লাভ ধরে রাখতে শ্রম ও উৎপাদন খরচ কমানো জরুরি, বিশেষত কৃষি খাতে জনবল সংকটের এই সময়ে। মূলত এই বিবেচনা থেকেই তিনি আইগামো রোবট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।
রোবটের বিকল্প হিসেবে হাঁস ব্যবহারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাঁস পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ নিজেই একটি বাড়তি কাজ, তাই তিনি সেই পথে যেতে চান না। বর্তমানে নিজের কয়েক হেক্টর জমিতে তিনি তিনটি রোবট ব্যবহার করছেন এবং ফলাফলে সন্তুষ্ট।
কৃষকদের মতে, এই রোবট শুধু আগাছা নিয়ন্ত্রণে শ্রম কমায় না, কীটনাশকের ব্যবহারও কমিয়ে দেয় এবং শামুকের মতো ক্ষতিকর প্রাণীর প্রভাবও অকার্যকর করে তোলে। এর পাশাপাশি জমির যে স্তরে মিথেন উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, রোবটের কার্যক্রম সেই স্তরের ক্ষয় ঘটিয়ে ধানখেত থেকে মিথেন নিঃসরণ কমাতেও সহায়তা করে। এ কারণে আইগামো রোবোকে শুধু একটি কৃষিযন্ত্র হিসেবে না দেখে জৈব কৃষি, জলবায়ু সচেতনতা ও শ্রমসাশ্রয়ী উৎপাদনব্যবস্থার সমন্বিত উদাহরণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে জাপানে কয়েক হাজার এই ধরনের রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিদেশেও এর পরীক্ষামূলক ব্যবহার এগিয়ে চলেছে। ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশে এর সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে এবং এ সংক্রান্ত একাধিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জাপানে বর্তমানে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা জমির পরিমাণ মোট কৃষিজমির ১ শতাংশেরও কম, যা অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় বেশ কম। দেশটির টেকসই কৃষিবিষয়ক ‘মিদোরি’ কৌশলে ২০৫০ সালের মধ্যে মোট কৃষিজমির প্রায় ২৫ শতাংশে জৈব চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ধানখেতের বিশাল আয়তন বিবেচনায় রাসায়নিক, শ্রম ও পরিবেশগত চাপ কমাতে সক্ষম এমন প্রযুক্তি জাপানে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্যও এমন প্রযুক্তি সম্ভাবনাময় হতে পারে। পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে চাল উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানিমুখী কৃষি খাত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আইগামো রোবোর মতো প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্ভাবক তেৎসুইয়া নাকামুরা নিজেও বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি চালুর বিষয়ে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন।
তবে জাপানের বাইরে এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এখনো মূলত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। কোন দেশে কবে বা কীভাবে এটি ব্যাপক আকারে চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কিছু জানা যায়নি। তবে জৈব চাষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও কৃষিতে জনবল সংকটের বাস্তবতায় সৌরচালিত এই ছোট রোবট ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশের ধানখেতে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মন্তব্য
এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.