ভিআর হেডসেট বলতেই এতদিন চোখে ভেসে উঠত মুখ ঢেকে রাখা একটি ভারী যন্ত্রের ছবি। মেটা এবার সেই চিরচেনা ধারণায় বড় পরিবর্তন আনতে চাইছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি উন্মোচন করেছে নতুন এক ভিআর ডিভাইস, যা দেখতে অনেকটা সাধারণ চশমার মতো এবং ওজনে অবিশ্বাস্য রকম হালকা।
নতুন এই ডিভাইসের নাম দেওয়া হয়েছে মেটা ভিআর গ্লাসেস। এর ওজন মাত্র ১০০ গ্রাম, যা প্রচলিত ভিআর হেডসেটের তুলনায় অনেকটাই কম। বাজারে আসার আগেই ডিভাইসটি নিয়ে প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
গত বুধবার মেটার প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত মেটা কানেক্ট সম্মেলনে ডিভাইসটি সবার সামনে প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ নিজেই নতুন এই ভিআর গ্লাসেসের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
জাকারবার্গের ভাষ্যমতে, মেটা ভিআর গ্লাসেসের ওজন মেটা কোয়েস্ট ৩ হেডসেটের তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির আগের প্রজন্মের হেডসেটের তুলনায় এটি অনেক হালকা ও আরামদায়ক হতে যাচ্ছে বলে মনে করছে মেটা।
নতুন এই ভিআর চশমার দাম রাখা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ মার্কিন ডলার। আগামী বছর প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিভাইসটি কেনার সুযোগ পাবেন ক্রেতারা। অন্য দেশে কবে নাগাদ এটি পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানায়নি মেটা।
এত হালকা করার পেছনে রয়েছে একটি ভিন্ন ধরনের নকশা কৌশল। চশমার মূল ফ্রেমে শুধু ডিসপ্লে ও প্রয়োজনীয় সেন্সরগুলো রাখা হয়েছে। অন্যদিকে প্রসেসর, ব্যাটারি ও স্টোরেজের মতো ভারী উপাদানগুলো রাখা হয়েছে আলাদা একটি ছোট বাক্সে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘পাক’।
এই পাক নামের বাক্সটি ব্যবহারকারীরা পকেটে রাখতে পারবেন কিংবা ক্লিপের সাহায্যে ব্যাগের সঙ্গে আটকে রাখতে পারবেন। এর ফলে মাথায় বাড়তি ওজন বহন করতে হবে না, আবার প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার সুবিধাও পাওয়া যাবে।
মেটার তথ্য অনুযায়ী, চশমাটিতে মাইক্রো ওএলইডি প্যানেলের ৫কে রেজল্যুশনের একটি ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ইনফিনিট ডিসপ্লে’। প্রতি ডিগ্রি জায়গায় ৩৭টি পিক্সেল থাকার কারণে লেখা ও সূক্ষ্ম বিষয়বস্তুও স্পষ্টভাবে দেখা যাবে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আকারে ছোট রাখা হলেও ছবির মান যাতে খারাপ না হয়, সে জন্য চশমাটিতে ব্যবহার করা হয়েছে প্যানকেক লেন্স, যা আধুনিক অপটিক্যাল প্রযুক্তির একটি অংশ।
মেটা ভিআর গ্লাসেসের অপারেটিং সিস্টেমে সরাসরি যুক্ত রয়েছে মেটা এআই। এর ফলে ব্যবহারকারীরা কণ্ঠস্বর, চোখের নড়াচড়া এবং হাতের স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি দিয়েই ডিভাইসটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আলাদা কোনো কন্ট্রোলার ছাড়াই এআইয়ের সাহায্যে অ্যাপ চালু করা, ভার্চ্যুয়াল ওয়ার্কস্পেস বদলানো কিংবা অনলাইনে তথ্য খোঁজার মতো কাজ করা সম্ভব হবে।
এর ফলে ঘরে বসে থেকে অফিসের কিছু কাজও এই চশমা দিয়ে করার সুযোগ থাকছে বলে জানিয়েছে মেটা।
সিনেমা কিংবা ভিডিও দেখার অভিজ্ঞতা আরও উপভোগ্য করতে চশমাটিতে যুক্ত করা হয়েছে ডলবি ভিশন এবং ডলবি অ্যাটমস স্পেশাল অডিও প্রযুক্তি। মেটার দাবি, এর ফলে ব্যবহারকারীরা বড় পর্দায় সিনেমা দেখার মতোই অভিজ্ঞতা পাবেন, সঙ্গে চারপাশ থেকে শব্দ আসার অনুভূতিও থাকবে।
প্রচলিত ভিআর হেডসেটের সঙ্গে এই চশমার একটি বড় পার্থক্য হলো, এর দুই পাশ খোলা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে পাসথ্রু ক্যামেরা, যার মাধ্যমে চশমা পরা অবস্থাতেও আশপাশের পরিবেশ দেখতে পারবেন ব্যবহারকারীরা। ফলে সম্পূর্ণভাবে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়েই ভার্চ্যুয়াল কনটেন্ট উপভোগ করা যাবে।
মেটা ভিআর গ্লাসেসে ব্যবহার করা হয়েছে কোয়ালকমের নতুন স্ন্যাপড্রাগন রিয়েলিটি এলিট প্রসেসর। ব্যাটারি নিয়ে মেটা জানিয়েছে, একবার পূর্ণ চার্জে ডিভাইসটি সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে।
হালকা ওজন, উন্নত ডিসপ্লে এবং হাতে ও চোখের ইশারায় নিয়ন্ত্রণের সুবিধা নিয়ে আসা মেটা ভিআর গ্লাসেস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভারী ভিআর হেডসেটের ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে। আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এটি আসার পর সাধারণ ব্যবহারকারীরা কতটা সাড়া দেন, তার ওপরই নির্ভর করবে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।
মন্তব্য
এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.