বিশ্বজুড়ে একের পর এক আইনি বিপত্তিতে পড়া প্রযুক্তি সংস্থা মেটার জন্য নতুন এক অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। কিশোর কিশোরীদের সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্ত করার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি লড়াই এবার নিষ্পত্তির পথে। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠানটি, যার আওতায় সর্বোচ্চ এক হাজার ৭১০ কোটি ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে সংস্থাটি। প্রযুক্তি খাতের ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় অঙ্কের একটি ক্ষতিপূরণ চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাদের প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম ও বিভিন্ন ফিচার এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ব্যবহারকারী, বিশেষত অপ্রাপ্তবয়স্করা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে আটকে থাকে। অনেক দেশ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দাবি ছিল, এই ধরনের নকশার কারণে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এর পাশাপাশি আরও একটি গুরুতর অভিযোগ ছিল, অভিভাবকের সম্মতি ছাড়াই কম বয়সী ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে মেটা। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শিশু অনলাইন গোপনীয়তা সুরক্ষা আইন এবং ভোক্তা সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও যুক্ত হয়। এই সব অভিযোগের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬টি অঙ্গরাজ্য, ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া এবং কয়েকটি মার্কিন অঞ্চলের অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে একটি সমন্বিত সমঝোতা নথিভুক্ত হয়।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর মামলাটি এখন প্রায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তির কাছাকাছি। ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতের বিচারক ইভন গঞ্জালেজ রজার্স এই সমঝোতা অনুমোদনের প্রক্রিয়া তদারক করছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে করা কয়েকশ পৃথক মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, অর্থাৎ মেটার আইনি জটিলতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
সমঝোতা চুক্তিতে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বিষয়টি। মেটাকে তাদের প্ল্যাটফর্মে বেশ কিছু নীতিগত ও কারিগরি পরিবর্তন আনতে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পরিবর্তন হলো:
এই পদক্ষেপগুলোর মূল লক্ষ্য হলো কম বয়সী ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও আসক্তি কমিয়ে আনা।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের করা ক্ষতিপূরণের দাবি মেটাতে সর্বোচ্চ এক হাজার ৭১০ কোটি ডলার পর্যন্ত দিতে সম্মত হয়েছে মেটা। প্রযুক্তি খাতে এত বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণের নজির খুব বেশি নেই, যা এই মামলার গুরুত্ব ও প্রভাবের পরিমাপ স্পষ্ট করে।
আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই সমঝোতাকে মেটার বিরুদ্ধে নেওয়া অন্যতম কঠোর আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যথেষ্ট পরিমাণে প্রমাণিত হওয়ার কারণেই এত বড় অঙ্কের জরিমানার সিদ্ধান্ত এসেছে।
এই সমঝোতা শুধু মেটার জন্য নয়, পুরো সামাজিক মাধ্যম শিল্পের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। শিশু ও কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে উদ্বেগ বাড়ছে, তার প্রেক্ষাপটে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ভবিষ্যতে আরও কড়া নজরদারি ও জবাবদিহির পথে হাঁটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মামলাটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায়, চুক্তির পুরোপুরি বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব ঠিক কেমন হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলার সময় এখনো আসেনি। একইসঙ্গে আরও কয়েকশ মামলা বিচারাধীন থাকায়, প্রযুক্তি জায়ান্টটির আইনি চ্যালেঞ্জ নিকট ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
মন্তব্য
এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.