গভীর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ফোনের স্ক্রিনে হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। কেউ ভাবেন জরুরি কোনো বার্তা এসেছে, কিন্তু ফোন হাতে নিয়ে দেখা যায় সেটি নিছকই কোনো খাবারের অ্যাপের ছাড়ের বিজ্ঞাপন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ আপডেট। এমন অভিজ্ঞতা এখন প্রায় প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি ৯১ লাখের বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। এই বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর বড় অংশই দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজের জন্য ফোনের ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে প্রতিদিন তাদের সামলাতে হয় অসংখ্য অ্যালার্ট, মেসেজ ও নোটিফিকেশন।
তবে এসব নোটিফিকেশনের সবকটিই যে জরুরি তা নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ইমেইল বা পরিচিতজনদের বার্তার পাশাপাশি ব্যবহারকারীরা প্রতিনিয়ত পেতে থাকেন অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় আপডেট, যেমন নতুন ভিডিওর তথ্য, খাবারের ছাড়ের কোড কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইকের বার্তা।
বারবার ফোন কাঁপা বা আলো জ্বলে ওঠা শুধু মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় না, দীর্ঘমেয়াদে তৈরি করে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তিও, যাকে বলা হয় ‘অ্যালার্ট ফ্যাটিগ’। এ থেকে বাঁচতে অনেকেই সরাসরি ফোনের ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোড চালু করে সব নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেন। তবে এমন কিছু কৌশল আছে, যেগুলো ব্যবহার করলে জরুরি নোটিফিকেশন ঠিকই পাওয়া যাবে, আবার অপ্রয়োজনীয় বিরক্তিও এড়ানো সম্ভব হবে।
আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড, যে অপারেটিং সিস্টেমই ব্যবহার করা হোক না কেন, নিচের ছয়টি পদ্ধতি নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
নোটিফিকেশন সেটিংসে হাত দেওয়ার আগে ফোনে থাকা অ্যাপগুলো একবার যাচাই করে নেওয়া জরুরি। যেসব অ্যাপ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হচ্ছে না, সেগুলো আনইনস্টল করে দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নোটিফিকেশনের সংখ্যা কমে আসে। সাধারণত অ্যাপ আইকনে কিছুক্ষণ চেপে ধরে রাখলেই তা রিমুভ বা আনইনস্টল করার অপশন চলে আসে।
স্ক্রিন হঠাৎ আলোকিত হয়ে উঠলে চোখ স্বাভাবিকভাবেই সেদিকে চলে যায়। এই প্রবণতা কমাতে নোটিফিকেশন দেখানোর ধরন বদলে ফেলা যেতে পারে।
আইফোনে সেটিংস, তারপর নোটিফিকেশন, এরপর ডিসপ্লে অ্যাজ অপশনে গিয়ে ‘কাউন্ট’ নির্বাচন করলে আলাদা আলাদা নোটিফিকেশনের বদলে শুধু মোট সংখ্যাটি দেখা যাবে। প্রয়োজনে লক স্ক্রিন থেকে সোয়াইপ করে বিস্তারিত দেখে নেওয়া যায়।
অ্যান্ড্রয়েডে ফোনভেদে ধাপ কিছুটা আলাদা হতে পারে। সেটিংস অ্যাপে ‘লক স্ক্রিন’ লিখে খুঁজলে সংশ্লিষ্ট অপশন পাওয়া যায়। গুগল পিক্সেল ফোনে এটি থাকে ডিসপ্লে অ্যান্ড টাচ অপশনের অধীনে, আর স্যামসাং ফোনে সেটিংস থেকে নোটিফিকেশন মেনুতে গেলে এই সুবিধা মেলে।
প্রতিটি নোটিফিকেশন আলাদাভাবে আসার বদলে দিনের নির্দিষ্ট কোনো সময়ে সেগুলো একসঙ্গে সারসংক্ষেপ আকারে পাওয়ার ব্যবস্থাও করা যায়।
আইফোনে সেটিংস থেকে নোটিফিকেশন এবং সেখান থেকে সিডিউলড সামারি অপশন চালু করে কোন অ্যাপের নোটিফিকেশন এতে যুক্ত হবে এবং কোন সময়ে তা পাওয়া যাবে, তা ঠিক করে দেওয়া যায়। তালিকায় কাঙ্ক্ষিত অ্যাপ না থাকলে সেটিংসের অ্যাপস অংশ থেকে সেই অ্যাপের জন্য নোটিফিকেশন অনুমোদন চালু করে দিতে হবে।
গুগল পিক্সেল ফোনে রয়েছে নোটিফিকেশন অরগানাইজার নামের একটি ফিচার, যা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে কম গুরুত্বপূর্ণ নোটিফিকেশনগুলোকে একত্র করে নীরব রাখে। স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোনে সেটিংস, নোটিফিকেশন, সর্ট অ্যান্ড ফিল্টার হয়ে ‘সর্ট নোটিফিকেশন বাই প্রায়োরিটি’ অপশন নির্বাচন করলে একই সুবিধা পাওয়া যায়।
আইফোন ব্যবহারকারীরা এক ট্যাপেই ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ ফিচার চালু করে সব ধরনের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে পারেন। এর পাশাপাশি কাজ, ঘুম কিংবা গাড়ি চালানোর মতো পরিস্থিতির জন্য আলাদা প্রিসেট ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে, যেখানে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ চালু থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপ বা ব্যক্তির নোটিফিকেশন চালু রাখা যায়। যেমন ঘুমের সময়ে জরুরি প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কারও কল গ্রহণের অনুমতি দেওয়া যায়, আবার কাজের সময় শুধু ইমেইলের নোটিফিকেশন সচল রেখে বাকি সবকিছু নীরব রাখা সম্ভব।
আগে থেকে থাকা প্রিসেটে কাজ না হলে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ফোকাস মোডও তৈরি করা যায়। আইফোনের স্ক্রিনের ডানদিকের ওপর থেকে নিচে সোয়াইপ করে ফোকাস মোডে গিয়ে প্লাস চিহ্নে চাপ দিলে নতুন মোড তৈরির অপশন আসে, যেখানে কোন নোটিফিকেশন সাইলেন্ট থাকবে এবং কখন তা কার্যকর হবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া যায়।
অ্যান্ড্রয়েডেও একই ধরনের সুবিধা আছে। পিক্সেল ফোনে সেটিংস থেকে ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং অংশে গিয়ে ফোকাস অপশন থেকে সময় ও অ্যাপ নির্ধারণ করা যায়। অন্যান্য অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সেটিংসে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ লিখে খুঁজলেই কাস্টমাইজেশনের সুযোগ মেলে।
অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীকে অ্যাপে ফেরাতে নিয়মিত প্রমোশনাল নোটিফিকেশন পাঠায়, যার বেশিরভাগই মূলত অপ্রয়োজনীয়। তবে চাইলে নির্দিষ্ট করে কোন অ্যাপ থেকে নোটিফিকেশন আসবে আর কোনটি থেকে আসবে না, তা ঠিক করে দেওয়া যায়।
আইফোনে সেটিংস থেকে নোটিফিকেশনে গেলে নিচের দিকে ফোনে থাকা সব অ্যাপের তালিকা দেখা যায়। কাঙ্ক্ষিত অ্যাপে ট্যাপ করে অ্যালাউ নোটিফিকেশন অপশন বন্ধ করে দিলেই সেই অ্যাপ থেকে আর কোনো নোটিফিকেশন আসবে না। অ্যান্ড্রয়েডে সেটিংস, নোটিফিকেশন, অ্যাপ নোটিফিকেশন অংশে গিয়ে (পিক্সেল ফোনে অল অ্যাপস) যেকোনো অ্যাপের নোটিফিকেশন একইভাবে বন্ধ করা যায়।
একসঙ্গে সব সেটিংস বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। কোন অ্যাপ দিয়ে শুরু করা উচিত তা নিয়ে দ্বিধা থাকলে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া যায়। কোনো নোটিফিকেশন আসার পর সেটির ওপর থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে সেটিংস পরিবর্তন করা যায়।
আইফোনে আসা কোনো নোটিফিকেশনের ওপর ডানদিকে সোয়াইপ করে অপশন থেকে ‘মিউট ফর ওয়ান আওয়ার’ বা ‘মিউট ফর টুডে’ নির্বাচন করা যায়, যা স্থায়ীভাবে না হয়ে সাময়িক সময়ের জন্য নোটিফিকেশন বন্ধ রাখে। পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইলে সেখান থেকেই ‘টার্ন অফ’ অপশনে চাপ দিলে হবে।
গুগল পিক্সেল ফোনে রয়েছে ‘নোটিফিকেশন কুলডাউন’ নামের একটি ফিচার, যা অল্প সময়ের মধ্যে একসঙ্গে অনেক নোটিফিকেশন এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেগুলোর শব্দ কমিয়ে দেয় এবং একত্র করে ফেলে। প্রয়োজনে ওপর থেকে নোটিফিকেশন মেনু টেনে নামিয়ে এগুলো দেখে নেওয়া যায়। এই ফিচারটি চালু করতে সেটিংস থেকে নোটিফিকেশনসে গিয়ে জেনারেল ট্যাবের অধীনে থাকা ‘নোটিফিকেশন কুলডাউন’ অপশন চালু করতে হবে।
প্রযুক্তি যত বেশি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে, ততই বাড়ছে ডিজিটাল বিরক্তির মাত্রা। তবে একবারে সব নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেওয়ার বদলে সচেতনভাবে সেটিংস সাজিয়ে নিলে জরুরি তথ্য হাতছাড়া না করেও দৈনন্দিন মানসিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড, যেকোনো ফোনেই এই সহজ পরিবর্তনগুলো একটু সময় নিয়ে করে নিলে দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যবহারকারীর মনোযোগ ও মানসিক প্রশান্তি দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মন্তব্য
এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.