সকালে ঘুম থেকে উঠে আবহাওয়া দেখলেন, গুগলে খবর খুঁজলেন, বাইরে বের হওয়ার সময় মানচিত্রে রাস্তা দেখলেন। পরে ইউটিউবে ভিডিও দেখলেন বা অনলাইনে কোনো পণ্যের খোঁজ করলেন। আপনার কাছে এগুলো আলাদা আলাদা কাজ মনে হলেও গুগলের কাছে এগুলো আপনার দৈনন্দিন অভ্যাস ও আগ্রহের কিছু ইঙ্গিত।
সকালে ঘুম ভাঙার পর আবহাওয়া দেখা, অফিসে যাওয়ার আগে গুগল ম্যাপে রাস্তা যাচাই করা, ফাঁকা সময়ে ইউটিউবে ভিডিও দেখা কিংবা কোনো পণ্যের দাম গুগলে খোঁজা। এই কাজগুলো আলাদা আলাদা মনে হলেও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলের চোখে এগুলো একজন ব্যবহারকারীর অভ্যাস, পছন্দ ও আগ্রহ বোঝার সূত্র।
ব্যবহারকারী কী খুঁজছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কোন বিজ্ঞাপনে ক্লিক করছেন কিংবা কোন বিষয়ে বারবার আগ্রহ দেখাচ্ছেন, সেই সব তথ্য গুগলের সিস্টেমে জমা হওয়ার সুযোগ থাকে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই গুগল একজন মানুষের আচরণ সম্পর্কে একধরনের ধারণা তৈরি করে ফেলতে পারে।
তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতে পারে, গুগল আসলে একজন ব্যবহারকারী সম্পর্কে কতটা জানে? এর উত্তর নির্দিষ্ট কোনো একটি সংখ্যায় দেওয়া যায় না। বরং তা নির্ভর করে ব্যবহারকারী গুগলের কোন কোন সেবা ব্যবহার করছেন এবং অ্যাকাউন্টে কোন গোপনীয়তা সেটিং চালু রেখেছেন, তার ওপর।
কয়েক মাস আগে গুগলে কী খোঁজা হয়েছিল, তা মনে রাখা কঠিন। হয়তো কোনো ভ্রমণ গন্তব্য, চাকরির বিজ্ঞাপন কিংবা কোনো পণ্যের তুলনামূলক দাম নিয়ে একের পর এক সার্চ করা হয়েছিল।
গুগল অ্যাকাউন্টে ‘ওয়েব অ্যান্ড অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি’ নামের সেটিং সক্রিয় থাকলে এসব অনুসন্ধান এবং গুগলের বিভিন্ন সেবা ব্যবহারের তথ্য জমা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ক্রোম ব্রাউজারে ভিজিট করা ওয়েবসাইট এবং গুগলের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য অ্যাপ ও ডিভাইসের কার্যকলাপও এর সঙ্গে যুক্ত হয়।
এসব তথ্য দেখার জন্য গুগল অ্যাকাউন্টে ‘মাই অ্যাক্টিভিটি’ নামের একটি পাতা রয়েছে। সেখানে তারিখ, সময় বা নির্দিষ্ট সেবা অনুযায়ী পুরোনো কার্যকলাপ খুঁজে বের করা যায়। ইচ্ছা করলে নির্দিষ্ট অংশ কিংবা পুরো তথ্য মুছে ফেলার সুযোগও রয়েছে। তবে কতদিন পর্যন্ত পুরোনো তথ্য সেখানে সংরক্ষিত থাকবে, তা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর হিস্টরি সেটিংসের ওপর।
কয়েকদিন ধরে শুধু ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও দেখলে ইউটিউব খোলার সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের ভিডিও বেশি করে সামনে আসতে দেখা যায়। কারণ কোন ভিডিও দেখা হচ্ছে এবং কী খোঁজা হচ্ছে, তার তথ্য ইউটিউবের হিস্টরিতে জমা থাকতে পারে। এই তথ্যের ভিত্তিতেই ব্যবহারকারীর জন্য ভিডিও সাজেশন তৈরি করা হয়।
বিজ্ঞাপন ব্যক্তিগতভাবে সাজানোর ক্ষেত্রে এই হিস্টরি ব্যবহার করা হবে কি না, তা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগও রয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিষয়ে যত বেশি আগ্রহ দেখানো হবে, গুগলের বিভিন্ন সেবায় সেই আগ্রহের প্রতিফলন তত স্পষ্ট হতে পারে।
গুগল কতটা সংবেদনশীল তথ্য রাখতে পারে, তার একটি বড় উদাহরণ হলো অবস্থান। কেউ কোথায় গিয়েছিলেন, কোন পথ ধরে গিয়েছিলেন কিংবা কোথায় কতক্ষণ অবস্থান করেছিলেন, এসব তথ্য গুগলের লোকেশনভিত্তিক সেবায় সংরক্ষিত হতে পারে।
‘টাইমলাইন’ নামের ফিচারটি চালু থাকলে যাতায়াতের ইতিহাস পরবর্তীতে দেখার সুযোগ থাকে। তবে এই তথ্য শুধু ফোনের জিপিএস বা লোকেশন সার্ভিসের ওপর নির্ভর করে না, ইন্টারনেট সংযোগ থেকেও আনুমানিক অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব। তাই ফোনের লোকেশন সেবা বন্ধ রাখলেই গুগল অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানবে না, এমন ধারণা ঠিক নয়। এক্ষেত্রেও ব্যবহারকারী কোন সেবা ব্যবহার করছেন এবং কী অনুমতি দিয়েছেন, তার ওপরই সবকিছু নির্ভরশীল।
অনলাইনে একটি জুতা খোঁজার কিছুক্ষণ পরই ইউটিউব বা অন্য কোনো ওয়েবসাইটে একই ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখা যাওয়া একটি পরিচিত অভিজ্ঞতা। অনেকের মনে হতে পারে, গুগল বুঝি কথোপকথন শুনছে। তবে বিষয়টি সবসময় এমন নয়।
গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা বিভিন্ন কার্যকলাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞাপন ব্যক্তিগতভাবে সাজায়। ‘মাই অ্যাড সেন্টার’ নামের একটি অংশ থেকে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ওয়েব অ্যান্ড অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি বা ইউটিউব হিস্টরির মতো তথ্য বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হবে কি না, তাও ঠিক করা সম্ভব।
তবে ব্যক্তিগতভাবে সাজানো বিজ্ঞাপন বন্ধ করলেই বিজ্ঞাপন দেখা একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে না। তখনও সার্চ, ব্যবহৃত ডিভাইস কিংবা আনুমানিক অবস্থানের মতো তথ্যের ভিত্তিতে প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞাপন দেখানো হতে পারে।
গুগলের সেবাগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। একই অ্যাকাউন্ট দিয়ে সার্চ, ইউটিউব, ম্যাপ, জিমেইল, ফটোস এবং অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করা হয়। ফলে এই সেবাগুলো আলাদা হলেও একই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং এক সেবার তথ্য অন্য সেবায় ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা সহজ করতে কাজে লাগানো হতে পারে।
যেমন, জিমেইলে পাওয়া উড়োজাহাজের টিকিটের তথ্য ব্যবহার করে ক্যালেন্ডার বা ম্যাপের মাধ্যমে সহায়তা দিতে পারে গুগল। এটি ব্যবহারে সুবিধা বাড়ায় ঠিকই, তবে একই সঙ্গে গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্নও তোলে। কারণ একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে একজন মানুষের ডিজিটাল জীবনের বড় একটি অংশ একই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
উত্তর হলো, না। গুগল মনের কথা পড়তে পারে না, আর ফোনে থাকা সব তথ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুগলের কাছে চলে যায় না। কোন তথ্য সংগ্রহ করা হবে, তা নির্ভর করে ব্যবহারকারী কোন সেবা ব্যবহার করছেন, কী অনুমতি দিয়েছেন, কোন হিস্টরি সেটিং চালু রেখেছেন এবং কোন গোপনীয়তা নিয়ন্ত্রণ বেছে নিয়েছেন তার ওপর।
গুগল ব্যবহারকারীদের নিজের তথ্য দেখার, ডাউনলোড করার এবং মুছে ফেলার সুযোগ দেয়। অর্থাৎ তথ্যের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাতেই থাকে, প্রশ্ন হলো সেই নিয়ন্ত্রণ আদৌ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না।
গুগল একজন ব্যবহারকারী সম্পর্কে কী জানে, তা যাচাই করা কঠিন কাজ নয়। গুগল অ্যাকাউন্টে ঢুকে ‘ডাটা অ্যান্ড প্রাইভেসি’ থেকে ‘মাই অ্যাক্টিভিটি’ অংশে গেলে সংরক্ষিত কার্যকলাপের তালিকা দেখা যায়।
‘হিস্টরি সেটিংস’ থেকে দেখা যায় ওয়েব অ্যান্ড অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি, টাইমলাইন এবং ইউটিউব হিস্টরি সংরক্ষণ চালু আছে কি না। বিজ্ঞাপনসংক্রান্ত তথ্যের জন্য যেতে হবে ‘মাই অ্যাড সেন্টারে’, যেখানে বিজ্ঞাপন সাজাতে কোন তথ্য ব্যবহার করা হবে তা ঠিক করা যায়।
চাইলে কিছু কার্যকলাপ নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলার ব্যবস্থাও করা যায়। গুগল এক্ষেত্রে ৩, ১৮ অথবা ৩৬ মাস পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলার সুযোগ রাখে।
আসল প্রশ্নটা তাই শুধু গুগল কতটা জানে তা নয়, বরং ব্যবহারকারী নিজে জানেন কি না গুগলকে কতটা জানার সুযোগ দিয়েছেন। একবার ‘মাই অ্যাক্টিভিটি’, ‘টাইমলাইন’ এবং ‘মাই অ্যাড সেন্টার’ খুলে দেখলেই অনেক ভুলে যাওয়া পুরোনো তথ্যের সন্ধান মিলতে পারে।
এই তথ্যগুলো যাচাই করার পরই স্পষ্ট হবে, গুগল একজন ব্যবহারকারী সম্পর্কে যতটা জানে বলে মনে করা হয়েছিল, বাস্তবে তা তার চেয়ে কম না বেশি।
মন্তব্য
এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.